নর্থ ইস্ট বাংলাদেশ সাইক্লিং…০১

দেশ ভ্রমণের ইচ্ছা সবারই করে। প্লেনে নয়, গাড়ীতে নয় – আমি সাইকেলে ঘুরতে পছন্দ করি। সাইকেলে ভ্রমণে অনেক কিছু শেখা যায়, প্রকৃতিকে দেখা যায় গভীর থেকে। তেমনই একটি ভ্রমনের জন্য বেছে নিলাম এই ঈদের ছুটিকে। নর্থ ইস্ট বাংলাদেশ সাইকেল ভ্রমণ, ৭ দিনে ৭০০ কি.মি.। প্ল্যানটা ছিল ইউটিউবার রাজেশ দার। ঈদের দিন বিকেলে পারভেজ, রাজেশ দা ও গাফ্ফার চলে এলো কাপাসিয়ায় আমাদের বাড়িতে। রাতে ভরপুর খাবার খেয়ে তারাতারি ঘুমিয়ে পরলাম কারণ ভোর ৪ টা থেকে আমাদের সাইকেল রাইড শুরু হবে। … ভোর ৩:৩০ মিনিট মোবাইলে এলার্ম বেজে উঠল। ফ্রেশ হয়ে সাইকেলের সব চেক করছিলাম। সব ঠিক আছে নিশ্চিত হয়ে আমরা ৪ জন ঠিক ৪:৩০ মিনিটে রাইড শুরু করলাম। আজকের গন্তব্য কিশোরগঞ্জ জেলার ইটনা। ভোরের অন্ধকার আর ঠান্তা হাওয়া মনে আনন্দের ছাপে সাইকেল চলতে লাগলো। পূর্ব দীগন্তের লাল সূর্য ধীরে ধীরে উকি মারছে। আমার বাড়ি থেকে ১০ কি. মি. সাইকেল চালিয়ে টোক বাজার ক্রস করলাম এবং কিশোরগঞ্জ জেলায় প্রবেশ করলাম। থানারঘাট মোড়ে এবার ১০ মিনিটের একটা ছোট্ট বিরতি চা/কফির জন্য। ২/১ জন আবার এই সুযোগে প্রকৃতির ডাকে সারা দিয়ে ছোট ঘরের দিকে ছুটলো। আমাদের সময় খুব অল্প ,সকাল ৮ টার মধ্যে ৪০ কি.মি. চালিয়ে বাজিতপুর ঘাটে পৌছাতে হবে ট্রলারের জন্য নইলে মোটা অংকের টাকা দিয়ে ট্রলার রিজার্ভ করতে হবে নতুবা বিকেলে ট্রলারে চড়তে হবে।চা/কফি সেরে দ্রুত আবার রওনা দিলাম। সকালের স্নিগ্ধ হাওয়া সবুজ প্রকৃতি আর বর্ষায় প্লাবিত বিল উপভোগ করতে করতে আমরা পৌছে গেলাম কটিয়াদি বাজার। এগারোসিন্দুর সাইকেল রাইডার্স (কিশোরগঞ্জ)- এর সামী কটিয়াদীতে আমাদের জন্য অপেক্ষা করছে। ও আমাদের সাথে ১ দিন থাকবে। কটিয়াদীতে আমরা ১০ মিনিটের বিরতি দিলাম। হাইওয়ের পাশে একটি ডাবের দোকান দেখতে পেলাম, আমি ও রাজেশ দা ২ টা ডাব খেয়ে নিলাম। যতই বেলা হচ্ছে রৌদ্রের প্রখরতা আরো বেড়ে যাচ্ছে। আমরা রাইড শুরু করলাম এবার বিরতি নেবো একদম বাজিতপুর ঘাটে।কিছুদূর যেতেই রাজেশ দা বলল- ভাই আমার ভাবীর বাড়ি সরারচর আমরা কি সেই পথে যাবো ? আমি বললাম হ্যাঁ, আমরাতো এই পথেই যাবো। বেচারা চট করে তার ভাবীর বাড়ি কল করল যে- আমরা আসছি। সরারচর রেলক্রসিং এর সাথেই উনাদের বাড়ি, আমরা উনাদের বাড়িতে গেলাম। সুন্দর দোতালা গ্রামের বাড়ি। হাত মুখ ধুয়ে ফ্রেশ হয়ে নিলাম। উনারা আমাদের জন্য নাস্তা রেডি করলেন-পরোটা, ডিমভাজি, সবজি সাথে ভাগলপুরের ঐতিহ্যবাহী মিষ্টি। নাস্তা সেরে সবার কাছ থেকে বিদায় নিয়েই চলে গেলাম বাজিতপুর ঘাটে, আমরা ট্রলারে যাবো অষ্টগ্রাম। কিন্তু দুর্ভাগ্য ‍সিরিয়ালী ট্রলার নেই, আমরা গেলে রিজার্ভ করে যেতে হবে । আমরা একটা দোকানে গিয়ে বিশ্রাম নিচ্ছিলাম এবং দেখছিলাম যে আরো কয়েকজন পেলে একসাথে ট্রলার রিজার্ভ করবো। কিন্তু সরকারী নিষেধাজ্ঞা থাকায় কোন টুরিস্ট বা বাইকার অষ্টগ্রাম-মিঠামইন-ইটনা রুটে যেতে পারবেনা, কারণ বাইকাররা ঐ রুটে টপস্পিডে বাইক চালাতে গিয়ে বেশ কিছু ভয়াবহ দুর্ঘটনার শিকার হয়েছে, তাই তাদের জন্য নিষেধ করা হয়েছে। কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে কাউকে না পেয়ে আমরা ছোট সাইজের একটা ট্রলার নিলাম, ভাড়া ১০০০/- । (বি:দ্র: যেহেতু আমরা সাইকেলে এসেছি তাই আমাদের কোন নিষেধ নেই)। আমাদের ট্রলার স্টার্ট করে দিলো।

হাওরের বুকে থই থই পানিতে দুলে দুলে চলছে আমাদের ট্রলার। চারদিকে শুধু পানি আর পানি , মনে হচ্ছিল সাগরের বুকে কোন দুর্গম পথ পাড়ি দিচ্ছি আমরা। দূরের গ্রামগুলোর একটা সময় ভ্যানিস হয়ে গেল, চারিদিকে শ্বেতশুভ্র , হাওরে অপর প্রান্তে যেন নেমে গেছে আকাশ । দীর্ঘ ২ ঘন্টা ট্রলারে হাওড় পাড়ি দিয়ে আমরা পৌছালাম অষ্টগ্রাম ঘাটে। হাওরের পাড়ের রাস্তা ধরে আমরা এগোচ্ছি, গ্রামের বাচ্চাদের পানিতে লাফালাফি ও জেলেদের টানাজাল দিয়ে মাছ ধরা, সাদা বাদামী নানা রঙের হাঁসের ঝাক দলে দলে ডুবাডুবি করছে পানিতে। এমন চমৎকার গ্রাম্য দৃশ্য আহা মনটা জুড়িয়ে গেল । অষ্টগ্রাম বাজার পেরিয়ে আমরা প্রবেশ করলাম অষ্টগ্রাম-মিঠামেইন-ইটনা রুটে, যেটা বর্তমানে বাংদেশের অদ্ভুদ সুন্দর অন্যতম একটি সড়ক। যেই রুটে বাইক চালানো সব বাইকারদের স্বপ্ন। সড়কটি মোট ৩৫ কি.মি. । বাংলাদেশের বর্তমান রাষ্ট্রপতি জনাব আব্দুল হামিদ স্যারের প্রচেষ্টায় এই সড়কটি তৈরি হয়েছে। হাওর অঞ্চলের জনগন শতশত বছর ধরে শুকনা মৌসুমে পায়ে হেটে ও বর্ষা মৌসুমে নৌকায় চলাচল করে আসছে । বছরের প্রায় ৬/৭ মাস এঅঞ্চল পানিতে থই থই করে। চাষাবাদ ও মাছ ধরা এই ২ পেষা গোটা হাওড় অঞ্চলের মানুষের মূল জীবনচালিকা। এসব অঞ্চলে ছেলেমেয়েদের ঠিকভাবে পড়াশুনা করার সুযোগও হয়না। রাষ্ট্রপ্রতি মহোদয়ের বাড়ি এই হাওড়ে হওয়ায় উনার সুবাদে এ অঞ্চলের মানুষ স্বস্থি অনুভব করছে। স্কুল, কলেজ, বাজারঘাট, রাস্তাঘাট, সেতু সবকিছুই উনার অবদান। দুধারে জল মধ্যখানে সোজা সড়ক যেন হাওরের বুক চিরে চলে গেছে লোকালয়ে। এমন সড়ক দেশে আর একটিও নেই। সত্যিই চমৎকার মনোমুদ্ধকর প্রকৃতি। সময়টা ঈদের ছুটি হলে পর্যটক তেমন নেই। আমরা ফাকা রাস্তায় ভালোভাবেই সাইকেল চালাচ্ছি। কিছুদূর পর পর দেখা স্থানীয় পিকনিক ট্রলার তারা ট্রলারে ঘুরতে বের হয়েছে , আর রাস্তারধারে ট্রলারের ভীড়িয়ে খাবার খাচ্ছে। খাবারে প্যাকেটগুলো রাস্তায় ও পানিতে যে যার মতন ফেলছে। এত সুন্দর জায়গা সেটাও কিছু পর্যটকদের জন্য নোংরা হয়ে যাচ্ছে। এটা খুব বাজে, সকলের সচেতন হওয়া উচিৎ।আমরা সাইকেল চালাচ্ছি আর মাঝে মাঝে থেমে ছবি তুলছি ও ভিডিও করছি আবার মাঝে মাঝে সাইকেল রেখেই হাওড়ের পানিতে ঝাপ দিচ্ছি। এত সুন্দর জায়গা প্রাণটা জুরিয়ে গেল। ওদিকে সিলেট থেকে ৯ জনের আরেকটা টিম আসছে মিঠমইনে, আমাদের সাথে যোগাযেগ করলো। বেলা ৩ টার দিকে আমরা পৌছাই ‍মিঠামইন বাজারে। প্রচন্ড ক্ষুদা পেয়েছে, দুপুরের খাবার খাওয়ার জন্য মিঠামইন বাজারে মাত্র ২ টা হোটেল সেখানে প্রচুর ভীর। আমরা সিরিয়াল ধরলাম টেবিল খালি হওয়ার সাথে সাথে বসে পরলাম। হাওড়ে এসেছি হাওড়ের মাছতো খেতেই হবে, কিন্তু দাম অনেক চড়া, কি আর করার খেলাম তৃপ্তি করে। খাওয়া শেষ করেই হোটেলের অপর পাশে একটা চায়ের দোকান দেখলাম। মহিষের দুধের চা , দাম ৫/- , দারুন টেস্ট। এবার আমরা চললাম রাষ্ট্রপতি মহোদয়ের বাড়ি দেখতে।

নদীর ধারে ছিম ছাম গ্রাম্য বাড়ি, নেই কোন রাজকীয় ভাব একদম সাধারণ আধাপাকা ঘর। পাশেই একটি সুন্দর মসজিদ সামনে খোলা মাঠ ও প্রাথমিক স্কুল। ঈদের সময় হওয়ায় বাড়িতে অনেক মেহমান, তাই বাড়ির ভেতরে যাবার অনুমতি নেই। ভিডিও করার জন্য পুলিশকে বলে শুধু আমি একা ভেতরে ২ মিনিটের জন্য গিয়েছি । তারপর আমরা বাড়ির সামনে মাঠে বসে বিশ্রাম নিচ্ছি এবং সিলেটের টিমের অপেক্ষা করছি। কিছুক্ষনের মধ্যে ওরা চলে আসলো। ওদের মধ্যে ৩ জন মিঠামইনে রাতে থেকে পরের দিন সিলেটে বেক করবে, ৩ জন কিশোরগঞ্জ শহরে থেকে পরের দিন বেক করবে, আর ২ জন কিশোরগঞ্জ হয়ে জামালপুর চলে যাবে আর সিলেটের জাহাঙ্গীর আমাদের টিমে যুক্ত হয়ে আমাদের সাথে রাইড দিবে। তাদের সবার সাথে গল্প করে ছবি তুলে সবাইকে বিদায় জানিয়ে কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিয়ে আমরা ইটনার উদ্যেশ্যে রওনা হলাম। সন্ধার আগেই পৌছে গেলাম ইটনায়। এদিকে রাজেশ দার পরিচিত একজন ভাই ইটনাতে অপেক্ষা করছিলেন, উনার বাড়ি ওখানেই। উনি মেহেদী ভাই, আমরা উনার কাছে পৌছালাম। উনি জানালেন আগের দিন ৪ জনের একটা সাইক্লিস্ট টিম ইটনাতে এসেছিলেন, তার মধ্যে ছিলেন বাংলাদেশের প্রথম এভারেস্ট বিজয়ী নিশাত মজুমদার আপু, এপি আপু, সোহাগ ভাই ও জুবায়ের ভাই। এডভেঞ্জারের সূত্রে আমি সবার সাথে পরিচিত। তাদের আসার কথা শুনে বেশ আনন্দ লাগলো। মেহেদী ভাই আমাদের জন্য হোটেল রেডি করে রেখেছিলেন, কিন্তু আমরা বললাম ক্যাম্পিং করবো এমন একটা জায়গা ব্যবস্থা করে দিতে। উনি সাথে সাথে নিয়ে গেলেন রাষ্ট্রপতি আব্দুল হামিদ সরকারী কলেজ মাঠে। হাওড়ের পারে দাড়িয়ে আছে ৪ তলা ভবন। কলেজের সিঁড়িটা অনেক চওড়া, সিঁড়ির গ্যাপে আমরা ক্যাম্প করার চিন্তা করলাম। সন্ধায় পাশেই একটা মসজিদের পুকুরে গোসল করে ফ্রেশ হয়ে নিলাম। মেহেদী ভাই আমাদের জন্য চা নাস্তার ব্যবস্থা করলেন। রাত হওয়ার সাথে সাথে আমাদের ক্যাম্প গ্রাউন্ডের চিত্র পাল্টে গেল। চাঁদের আলোয় আলোকিত হয়ে গেল কলেজের মাঠ, সাথে হাওড়ের ঠান্ডা বাতাস, পরিবেশটাকে আরো মনোমুগ্ধকর সৌন্দর্যে ভরে উঠলো। আমাদের মোবাইলগুলো কলেজের বারান্দায় চার্জ করতে দিলাম, কিন্তু লোডসেডিং ও বাবা !!! রাতের খাবারের জন্য আমাদের যেতে হবে ১ কি.মি. দূরে বাজারে, তাই আমি আর গাফ্ফার রয়ে গেলাম, আর বাকিরা বাজারে গেল খাবার খেয়ে আমাদের জন্য খাবার নিয়ে আসতে। রাতের খাবার হিসেবে খেলাম পরোটা ও ডিম ভাজি, খাবার খেয়ে ঘুমিয়ে পরলাম পরের দিন গন্তব্য সুনামগঞ্জ…

বি:দ্র:

পরিবর্তনটা শুরু হোক আমাদের নিজেদের থেকে, আমাদের ঘর থেকে। আমাদের ঘরকে আমরা ঠিক যেভাবে গুছিয়ে রাখি – আমরা চাইলে আমাদের পাড়া, মহল্লা, দেশ তথা পুরো পৃথিবীকে গুছিয়ে রাখতে পারি। শুধু প্রয়োজন সচেতনতা। ময়লা আবর্জনা যেভানে সেখানে না ফেলে, নির্দিষ্ট স্থানে ফেলবো। অপচনশীল যেকোন আবর্জনা যেমন পলিব্যাগ/প্যাকেট, বিভিন্ন রকম প্লাস্টিক , প্লাস্টিক বোতল এবং ধাতব দ্রব্য ইত্যাদি নির্দিষ্ট স্থানে ফেলবো অথবা নিজেদের সাথে নিয়ে এসে উপযুক্তভাবে ধ্বংস করবো। এই পৃথিবীটা আমাদের অতএব, এটাকে বাঁচিয়ে রাখার দায়িত্বও আমাদের। ভ্রমনে গিয়ে পরিবেশের যেন কোন ক্ষতি না হয় সেই দিক খেয়াল রাখা আমাদের প্রত্যেকেরই দায়িত্ব। নিজেরা নিজেদের জায়গা থেকে পরিবেশ রক্ষার কাজ করলে, প্রথিবী আরো সুন্দর ও সবুজে পরিপূর্ণ হয়ে উঠবে।

Share Your Social Media

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top